তোমাতেই_আসক্ত

তানিশা সুলতানা

পর্ব :০১

"তুমি মানো বা না মানো মেয়েটির সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে। এটা মি*থ্যে হয়ে যাবে না।
হাফিজুর চৌধুরীর কথা শুনে হাতের কাছে থাকা টি-টেবিল খানায় প্রচন্ড শক্তি প্রয়োগ করে ঘুষি মারে আবরার। মুহুর্তেই টি-টেবিলে ভেঙে গুড়িয়ে যায়। ঝনঝন শব্দে মুখরিত হয় গোটা ড্রয়িং রুম। শক্তপোক্ত হাতের পিঠেও ঢুকে গিয়েছে এক টুকরো কাঁচ। সেখান হতে গল গল করে গড়াচ্ছে লাল রংয়ের তরল পদার্থ। তাতে একটুও বিচলিত দেখালো না হাফিজুরকে। যেনো তিনি নিজ সিদ্ধান্তে অনড়। এই মুহুর্তে নাতী মা রা গেলেও তিনি দমে যাবে না।


আতিয়া বেগম আঁচলে মুখ গুঁজে কেঁদে ওঠে। শশুরের সামনে গিয়ে দুটো বাক্য উচ্চারণ করার সাহস তার নেই। আর না আছে ছেলেকে শান্ত করানোর শক্তি। মাঝেমধ্যে তিনি নিজেকে ব্য*র্থ মা বলে ঘোষিত করে। যে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
আবরার নিজের র ক্ত মাখা হাতের পানে দৃষ্টি রেখে গম্ভীর স্বরে বলে
"আমি তাকে মানি না৷ কবুল বলি নি৷ চালাকি করে কাবিন নামায় সাইন করিয়েছেন আপনি দাদাভাই।
নরেচরে বসে হাফিজুর। যেনো সে এই জবাবেরই অপেক্ষায় ছিলো৷ ধবধবে ফর্সা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বলে
" মানতে বাধ্য তুমি। চা*লাকি করেছি তবে চুরি করি নি।
(পানজাবির পকেট থেকে এক খানা কাগল বের করে সেটা আবরারের সামনে তুলো ধরে)
এটা তোমাদের কাবিনের কাগজ। এখানে স্পষ্ট তুমি
বাকিটা শেষ করতে পারে না হাফিজুর। আবরার কাগজ খানা ছিনিয়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। আশ্চর্য বনে যায় হাফিজুর। শক্ত কন্ঠে বলে
"আবরার কি করলে তুমি এটা? তোমাদের বিয়ের একমাত্র প্রমাণ ছিলো এই কাগজ।
আবরার কাগজের টুকরো ফ্লোরে ফেলে দেয়। হাফিজুরের চোখে চোখ রেখে বলে
" এবার আর বলতে পারবে না সে আমার বউ। ঝামেলা চুকে গেলো।
দাঁড়িয়ে পড়ে হাফিজুর। রাগান্বিত স্বরে বলে
"মেয়েটিকে আমি আমার কাছেই রাখবো। তোমার বউ পরিচয়ে। ঝামেলা চুকাতে দিবো না। মানতেই হবে তোমার। বিয়েটা ছেলে খেলা নয়।
আবরারও দাঁড়িয়ে পড়ে। দাদার থেকেও দ্বীগুণ তেঁজি স্বরে বলে
" তাহলে আমিই বেরিয়ে যাচ্ছি এই বাড়ি থেকে।
"দরজা খোলা আছে।
ব্যাসসস আবরার তাসনিন বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায় চৌধুরী বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে। একবার পেছন ফিরে তাকালে হয়ত দেখতে পেতো আতিয়া বেগম এর কন্দরত মুখশ্রী। দাদাভাই এর অসহায় চোখ দুটো।
আবরার চোখের আড়াল হতেই হাফিজুর চৌধুরী ধপ করে বসে পড়ে সোফায়। এক হাত চোখের ওপর রেখে হু হু করে কেঁদে ওঠে। কলিজা খানা তার পুরে যাচ্ছে। বুকে ব্যাথা হচ্ছে। মৃ*ত ছেলের একমাত্র স্মৃতি ছিলো কলিজার টুকরো নাতী। ছেলে গত হয়েছেন পনেরো বছর হবে। তখন আবরারের বয়স ছিলো দশ বছর। সেই থেকে হাফিজুর চৌধুরী দুই হাতে আগলে রেখেছেন আবরার আর তার মা আতিয়া বেগমকে। কখনোই এতটুকু দুঃখ তাদের পেতে দেয় নি। চাওয়ার আগেই হাজির করেছে প্রয়োজনীয় সকল কিছু। শুধুমাত্র বড় ছেলের বউ বাচ্চার সুবিধা অসুবিধার কথা চিন্তা করে ঢাকার শহরে গড়েছেন বিশাল অট্টালিকা। মেঝো ছেলে এবং ছোট ছেলের সাথে সম্পর্কে ছিন্ন করেছেন।
আতিয়া বেগম দৌড়ে আসে শশুরের নিকট। হাঁটু মুরে বসে পড়ে পায়ের কাছে। শশুরের হাত দুটো মুঠো করে ধরে অনুন্নয়ের সুরে বলে
" বাবা আবরারকে ফেরান। আমার ছেলে চলে যাচ্ছে।
হাফিজুর আতিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ছেলের বউকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা তার নেই। শুধু দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে
"যেদিন তার মনে হবে আমরা তার ক্ষতি করি নি। সেইদিন ঠিক চলে আসবে তোমার ছেলে। অপেক্ষা করো বউমা।
সত্যিই কি তাই?
এক বছর দুই বছর তিন বছর চার বছর পাঁচ বছর ছয় বছর সাত বছর আট বছর চলে গেলো আবরারের মনে হলো না তার দাদা এবং মা তার ক্ষতি করে নি। তেরো বছর বয়সী একটা মেয়ের সাথে তার জীবন জুড়ে দিয়ে ভুল করে নি। তাকে ঠকায় নি।
আট বছরে পাল্টে গিয়েছে অনেক কিছু। হাফিজুর চৌধুরী আর বেঁচে নেই। আবরারকে হারানোর শোকে বছর দুয়েক পড়েই পরলোক গমন করেছেন।
হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর সঙ্গে যখন পাঞ্জা লড়ছিলো তখন তার মেঝো ছেলে, ছোট ছেলে এবং একমাত্র মেয়ে ছুঁটে এসেছিলেন সকল অভিমান ভুলে। ক্ষমা চেয়েছেন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া বাবার পা জড়িয়ে। দম বের হওয়ার আগে হাফিজুর চৌধুরী অক্সিজেন মাক্স খুলে শেষবার দুটো কথাই বলেছিলেন
" শেষ বেলায় আবরারের মুখ খানা দেখতে পারলাম না৷
আর
তুলতুলকে তোমরা দেখে রেখো। আবরারের আমানত তোমাদের ভরসায় রেখে গেলাম।

ঘুমের ঘোরে অনুভব করে ঠান্ডা একটা জিব্বা চেটে দিচ্ছে তুলতুলের গোটা মুখ। যেনো জিব্বার মালিক জাগাতে চাইছে তাকে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। হাঁড় কাঁপানো শীতে পড়েছে। এমন সময় সাধের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালে নিশ্চয় ভালো লাগবে না৷ তুলতুলেরও ভালো লাগলো না। মুখ খানা কম্বলের তলায় নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। তবে জিব্বার মালিকের জন্য পারে না। সে যেনো পণ করেছে বিরক্তির সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে তুলতুলকে।
পিটপিট করে চোখ খুলে তুলতুল। কপাল কুঁচকে বলে
"এ্যানি ডোন্ট ডিস্টার্ব ।
বিড়ালটি মালিকের ঘুমঘুম কন্ঠস্বর শুনে থামলো। যেনো সে বুঝতে পারলো তার উপস্থিত টের পেয়েছে মালিক। আর জ্বালাতন করা ঠিক হবে না। তাই ভদ্র বাচ্চার মতো মালিক এর গা ঘেসে শুয়ে পড়ে। হাত পা নেরে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়। মিউ মিউ আওয়াজ তুলে কিছু একটা বোঝালো যেনো৷ তুলতুল পাশ ফিরে এ্যানির ওপর একটা হাত রাখে। শান্ত হয় এবং মুহুর্তের মধ্যেই সেও ঘুমিয়ে পড়ে।
কিছু সময়ের ব্যবধানে দুজনই চিৎকার করে লাফিয়ে ওঠে। কেনোনা দুজনের মুখেই কেউ ঠান্ডা পানি ঢেলে দিয়েছে। এ্যানি এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে যে। তুলতুলেরও ভয়ে বুক কাঁপছে। গভীর ঘুমে ছিলো হঠাৎ পানির ঝাপ্টা সামলে উঠতে সময় লাগে। যখনই বুঝতে পারে সে এবং তার ছোট্ট এ্যনি ভিজে জবুথবু হয়ে গিয়েছে তখনই বড়বড় নয়নে সামনে তাকায়। তিথি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। তুলতুল চোখ নামিয়ে শুকনো ঢোক গিলে। মুখ সহ জামার কিছু অংশ ভিজে গিয়েছে। কম্বলখানা চুপচুপে ভেজা। এ্যানি ছোটাছুটি থামিয়েছে। ঠান্ডা লাগছে বোধহয় তাই তুলতুলের কোলে এসে গুটিশুটি মেরে বসে পড়ে। তুলতুল নিজের কামিজের অংশ দিয়ে মুছিয়ে দিতে থাকে এ্যানির শরীর। এমনিতেই ঠান্ডা সহ্য হয় না তার। না জানি আবার অসুখ বাঁধিয়ে ফেলে।
এহেম আদিক্ষেতা সহ্য না তিথির তাই মুখ বাঁকিয়ে বলে
" মেলোড্রামা শেষ হলে এবার উঠুন মহারানী। অনেক কাজ পড়ে আছে। কাজ গুলো শেষ করে উদ্ধার করুন আমায়৷
তুলতুল এ্যানির শরীরে নজর রেখেই বলে
"ডাকলেই পারতে। এভাবে ভিজিয়ে কেনো দিলে? এবার শুকবে এই ভেজা কম্বল তোষক?
তিথি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। এলোমেলো জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে রাখতে জবাব দেয়
" আম্মু বললো না উঠলে পানি মারতে।
তুই তো জানিস আমি আম্মুর কথা ফেলতে পারি না।
তুলতুল পাল্টা কোনো কথা বলে না। এর সাথে কথা বললে কথা বাড়বে। এক পর্যায়ে ঝগড়া লেগে যাবে। তখন বকা গুলো তারই খেতে হবে। তাই এ্যানিকে কোলে নিয়েই বিছানা ছাড়ে। রুম থেকে বের হতে উদ্যত হলেই তিথি বলে ওঠে
"তোর বিলাইকে লুকিয়ে রেখে যা। ভাইয়া আসছে বাড়িতে। তার সামনে পড়লে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসবে৷ আর তুইও লুকিয়ে থাকবি।
তিথির কথা কানে তুলে না তুলতুল। তুহিন খুব ভালো। সে তুলতুলের এ্যানিকে ভীষণ ভালোবাসে। কিছুতেই ফেলবে এটা নিশ্চিত সে। (তুলতুল নাম অনেকেরই পছন্দ হয় নি তাই আদ্রিতা দিলাম)
"আমার শরীর ভালো নেই ভাবি। রান্না করতে পারবো না।
ক্লান্ত ভঙ্গিমায় সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলেন আতিয়া বেগম৷ বেশ কয়েকদিন যাবত গা গুলচ্ছে তার। মাছ মাংস খেতে পারছে না৷ মাথা ঘুরিয়ে বারংবার বমি আসছে। বয়স তার চল্লিশ ছুঁয়েছে। চেয়ারার জৌলুশ কমে এসেছে। চোখের নিচে কালি, দুই একটা চুলও সাদা হয়েছে।
শশুরের মৃত্যুর পরে তিনি স্বেচ্ছায় ভাসুরদের সাথে এক বাড়িতে থাকেন। দুটো ভাসুর খুবই স্নেহ করলেও তাদের বউ খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না আতিয়া বেগমকে। সুযোগ পেলেই কটাক্ষ করতে ভুলে না৷
রাজিয়া বেগম লক্ষ করে আতিয়া বেগমকে। বলবে বলবে করেও বলা হয় নি। আজকে কপাল কুঁচকে বলেই ফেলে
" কাল দেখলাম বমি করলে। মাছ খেতে পারলে না। ঘটনা কি? স্বামী ম রে ছে এতো বছর হয়ে গেলো। সন্তানরা ফেলে রেখে গেছে। এই সুযোগে কার সাথে শু ****য়ে ছিলে?
বড় ভাবির কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া করেন না আতিয়া বেগম। যৌবন কালে যখন স্বামী পরলোক গমন করেছিলেন। তখন বাবা ভাই বহুবার বলেছিলো "আতিয়া নতুন করে জীবন কর। এভাবে দিন যাবে না"
আতিয়ার মন গলাতে পারে নি। সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন বাবা ভাইয়ের সাথে।
তাচ্ছিল্য হাসি ফুটে ওঠে আতিয়ার ঠোঁটের কোণে। রাজিয়ার বিরক্তি আকাশ ছুঁই ছুঁই। বারংবার এগিয়ে আসেন ঝগড়া বাঁধাতে কথা কাটাকাটি করতে। কিন্তু পারে না। মাঝেমধ্যে তিনি হতাশ হয়। মনে মনে ভাবে "আতিয়া বেগম মানুষ না কি অন্য কিছু"
তবে আজকে তিনি ছাড়বেন না যেনো পণ করেছে। এগিয়ে এসে বসে আতিয়ার পাশে এবং বলেন
"তুমি কি ব্যাপারখানা ভেবে দেখছো না? দুটো সন্তানের মা হয়েছো। এই লক্ষণ গুলোর সাথে পরিচিত তুমি। কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেললে আগেই বলো। আমরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। এবোর্সন করিয়ে আনবো। ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবো।
চোখ খুলে আতিয়া। শান্ত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন রাজিয়া বেগমকে৷ কি অবলীলায় বলে ফেললো কথা গুলো। তার সন্তানরা কাছে থাকলে নিশ্চয় তাকে এভাবে অপমান করতে পারতো না কেউ।
আদ্রিতা এ্যানিকে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসে। বড় মায়ের বলা কথা গুলো সে শুনেছে। অপেক্ষায় ছিলো মা কখন প্রতিবাদ করবে? কখন বলবে " ভাবি এসব কিছু না। তুমি চিন্তা করিও না"
কিন্তু আদ্রিকে হতাশ করে দিয়ে চুপ থাকে আতিয়া। চোখ দুটো টলমল করে ওঠে। রাজিয়ার মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং কাঠ কাঠ গলায় বলে
"বড় মা।
আমার মাকে এমন কথা বলবেন না। তিনি ফুলের মতো পবিত্র। আপনার মন মানসিকতা পরিবর্তন করা দরকার
রাজিয়া দাঁড়িয়ে পড়ে। তেড়ে আসে আদ্রির দিকে। উচ্চস্বরে বলে
" কে কেমন আমি জানি না? দুটো চোখে সব তো দেখি। পাশের বাড়ির আফজালের ঘন ঘন বাড়িতে আসার কারণ বুঝি না আমি? নেহাৎ আমরা ভালো মানুষ তাই চুপ করে থাকি।
এ্যানি মিউ মিউ আওয়াজ তুলে। যেনে সে বুঝতে পেরেছে মহিলাটি আদ্রিকে বকা দিচ্ছে।
রাজিয়া বিড়ালের পানে তাকায়৷ পরপরই বলে
"তোর পবিত্র মাকে বলিস বাচ্চা নষ্ট করতে। বিধবা মানুষ। চাহিদা থাকতেই পারে। তাই বলে আমাদের মানসম্মান ডুবাতে দিবো না।
আর তুই ই বা কি বোঝাবি তুই ও তে বিধবা
আতিয়া বেগমও দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ দুটো ছলছল করছে তার। এতোক্ষণের এতো কথা তার গায়ে না লাগলেও এবারে কলিজায় লেগেছে। ধরে আসা গলায় মিনতি করে বলে
"এমন কথা বলবেন না ভাবি৷ আদ্রিতা বিধবা নয়৷ ও কখনোই বিধবা হবে না।
আদ্রি মুখ বাঁকিয়ে বলে
"আপনার বোধহয় স্মৃতি শক্তি হারিয়ে গিয়েছে। আপনি ভুলে গিয়েছেন৷ আমার বিয়ে হয় নি। মা তুমিও না। এর কথা শুনো না তো।
রাজিয়া আরও কিছু বলতে যাবে আতিয়া তার হাতটা মুঠো করে ধরে। ইশারায় মিনতি করে কিছু না বলতে। মুখ বাঁকায় রাজিয়া৷ আতিয়া বেগম এর থেকে হাত খানা ছাড়িয়ে নেয় ঝাড়া দিয়ে৷ রাগ তার আকাশ ছুঁই ছুঁই। আদ্রির গালে কষে একটা থা প্প ড় দিতে পারলে শান্তি লাগতো। সাহস কতো তাকে বলে তার না কি স্মৃতি শক্তি হারিয়েছে।
" তুই তোর মাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারিস না এই বাড়ি থেকে? আমাদের একটু শান্তি দিতে পারিস না?
আদ্রিও সমান তালে বলে
"এই বাড়িটা বড় মায়ের ছেলের৷ তাহলে এখান থেকে তোমরা বের
বাকিটা শেষ করার আগেই রাজিয়া বেগম এর হাত উঠে যায় আদ্রির গালে। খুবই শক্ত একটা থা প্প ড়ে চুপ করিয়ে দেয়। মাথা ভনভন করছে আদ্রির। কিছু মুহুর্ত চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। কানে আসে আতিয়া বেগম এর আর্তনাদ। অনুভব করে নরম তুলতুলের এক খানা হাত জড়িয়ে ধরেছে আদ্রিকে।
থেমে নেয় রাজিয়া। উচ্চস্বরে বলেই চলেছে
" বাইরের মেয়ে হয়ে আমাকে এসব বলার সাহস কোথায় পায়? মুখ বেড়ে গিয়েছে? একদম ভে ঙে গু ড়ি য়ে দিবো। আবরার একটা চোর। সে চুরি করে আমার শশুরের থেকে বাড়ি লিখে নিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। আমাদের ঘাড়ে রেখে গিয়েছে উটকো ঝামেলা। তার মা একটা বেহায়া মহিলা। বুড়ো বয়সে পে ট বাঁধিয়েছে।
এমন আর অনেক কিছু। আদ্রি চোখ খুলে। তার কোলে থাকা এ্যানি মিউ মিউ আওয়াজ তুলে বকা দিচ্ছে রাজিয়া বেগমকে। কতো বড় সাহস তারই মনিবের গায়ে হাত তুলেছে। আদ্রি কোল থেকে নামালে এতোক্ষণে খামচে দিতো রাজিয়াকে৷ আতিয়া বেগম স্নেহ মাখা হাত বুলিয়ে দেয় আদ্রির গালে। কপাট রাগ দেখিয়ে বলে
"বেশি কথা কেনো বলিস তুই? চুপ থাকা যায় না?
আদ্রি মৃদু হেসে মাথা ঠেকায় আতিয়া বেগম এর বুকে এবং ধরে আসা স্বরে বলে
"চলো না মা আমরা দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে তুমি আমি ছাড়া কেউ থাকবে না৷ আমাদের শান্তির একটা সংসার হবে।
জবাব দেয় না আতিয়া বেগম। মনে মনে বলে
"আমাদের কপালে শান্তি লেখা নেই রে মা। আমরা যে পোরা কপাল নিয়ে দুনিয়ায় এসেছি। আমার আবরার আমাদের দুখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে।

সুইজারল্যান্ড এর জুরিখ শহর নির্জন এবং নিস্তব্ধ। বাংলাদেশের মতো যানজট, শব্দ দূষণ, কোলাহল এসবের অস্তিত্ব নেই। ভোরের আলো ফুটেছে বেশ কয়েক ঘন্টা আগেই৷ কর্মজীবী মানুষ জন ছুটে চলেছে নিজ নিজ কর্মস্থলে। রোডের সাথে অবস্থিত ছোট বাড়িটিতে এখনো আলো জ্বলে নি। বাড়ির ভেতরটা অন্ধকারে ছেয়ে আছে। যেনো সূর্য মামা এখনো ওঠে নি৷
বাড়ির মেইন ফটক পেরুলেই নজরে পড়ে বিশাল ড্রয়িং রুম৷ বড় বড় চার খানা সোফা চারিপাশে বসানো। মাঝখানে টি-টেবিল। সেই টেবিলের ওপরে আর্কিট ফুলের একখানা টব রাখা।
বাম পাশে কিচেন৷
এবং সোজাসুজি সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই নজরে পড়বে দুটো রুম। একটা রুমের সামনে বড়বড় অক্ষরে লেখা "Abrar Tasnin" অপর রুম খানা হতে হাই তুলতে তুলতে বেশ হয় সিয়াম। ঘুম তার এখনো পুরোপুরি কাটে নি৷ চোখ দুটো যেনো লেগে আসছে৷ হাতে বড় এক খানা ফোন। দৃষ্টি তার এখনো ফোনের স্কিনে। ললাটে তিনটে ভাজ পড়েছে। মূলত ঘুম ছোটানোর উদ্দেশ্যে ফেন খানা হাতে তুলে ছিলো। ফেসবুকের নিউজফিড ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ নজর আটকেছিলো এড ফ্রেন্ডে আসা একটা আইডির পানে। তখুনি তরিঘরি করে বিছানা ছেড়েছে সে।
সিয়াম আবরারের কক্ষের দরজায় টোকা দেয়। দৃষ্টি পড়ে নেইম-প্লেটের ওপর। বিরবির করে একবার নাম খানা পড়ে নেয়। পরপরই মুখ বাঁকায়৷
"শালা তোর নাম আবরার সেটা আমরা জানি৷ আমাদের জানাতে হবে না।
পরপরই আবারও টোকা দেয়। ভেতর হতে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না৷
বিরক্ত হয়ে সিয়াম দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ডান পাশে থাকা সুইচবোর্ডের বাটন টিপে রুমটা আলোকিত করে।
কোমর ওবদি কম্বল জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে আবরার। বড় বড় চুল গুলো এলোমেলো। দুই হাত ওপর দিকে দিয়েছে। ফর্সা বুকের কালো কয়লার ঠিক ওপরে সাদা রংয়ের ব্যান্ডেজ জড়ানো৷ নাভির বাম পাশেও ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ। কপালে র ক্ত শুকিয়ে টানটান হয়ে আছে।
সিয়াম এগিয়ে যায়৷ আবরারের শরীর হতে কম্বল টান মেরে নিয়ে নেয়৷ হাত বাড়িয়ে কাটা জায়গা গুলো ছুঁয়ে দেয় আলতো করে। পরপরই বলে
" আবরার ব্রো অহনা ছাড়াও তোর আরও একটা বোন আছে?
আগে তো বলিস নি। কি কিউট রে তোর বোন৷ আন্টির সাথে পিকচার আপলোড করেছে ফেসবুকে।
আবরার চোখ খুলে। তাকায় সিয়ামের পানে। বা ভ্রুটা উঁচু করে। ব্যাসস সিয়াম বুঝতে পারে।
"কথা বলতে কি প্রবলেম তোর। সব সময় এমন ইশারা কেন করিস? মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি তোর বউ বাচ্চাদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছি। তোর জোর রোমাঞ্চ পেয়েছে তাই ইশারায় ডাকছিস কাছে যেতে৷
সিঙ্গেল লাইফে এমন ইশারা কতোটা যন্ত্রণাদায়ক বুঝিস তুই?
আবরার ধীরে সুস্থ উঠে বসে। বা হাতে চুল গুলো পেছনে ঠেলে হামি তুলে। দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির পানে নজর বুলিয়ে সময় দেখে নেয়। পরপর গম্ভীর স্বরে বলে
" স্টপ দ্যা ড্রামা এন্ড টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড?
সিয়াম ধপ করে বসে পড়ে আবরারের পাশে৷ ফোন খানা এগিয়ে দেয়। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আতিয়া বেগম এর কাঁধে মাথা রেখে দূরে অবস্থিত সাগর দেখাচ্ছে একটা মেয়ে। নীল রংয়ের টপস এবং কালো জিন্স পরনে তার। গলায় ঝুলছে নীল রংয়ের ওড়না। লম্বা চুল গুলো হাঁটু ছাড়িয়ে গিয়েছে। আবরারের চোখ আটকায় ক্যাপশনে। সেখানে লেখা রয়েছে
"আই উইশ আমার জীবনে একজন সুপারহিরো আসতো। আমাকে আর আমার মাকে নিয়ে চলে যেতো অনেক দূরে। যেখানে সবাই আমাদের ভালোবাসতো এবং সম্মান করতো।
সিয়ামের ফোন খানা শূন্যে ছুঁড়ে মারে আবরার। রুম ছাড়িয়ে বেলকনি পেরিয়ে তার স্থান হয় বাগানে। ইতোমধ্যেই চোয়াল শক্ত করে ফেলেছে। লাল লাল আঁখি দুটোয় যেনে আগুন ঝড়ছে স্তব্ধ সিয়াম খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে আবরারের মুখ পানে। পরপরই কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে
"আমার ফোন তোর কি ক্ষতি করেছিলো ভাই? পাঁচ দিন হলো ফোন টা কিনেছিলাম।
ফোঁস করে শ্বাস টানে আবরার। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা চিন্তা করে। তারপট খাটের পাশে থাকা টি-টেবিলের ওপরে থাকা চার্জার হতে ফোন তুলে ব্যস্ত ভঙ্গিমায় কিছু করতে করতে সিয়ামকে আদেশের স্বরে বলে
" দুটো টিকেট এর ব্যবস্থা কর ইমিডিয়েটলি।
ফেনের শোক ভুলে চিন্তিত হয়ে পড়ে সিয়াম। পরপরই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। বাই এনি চান্স আবরার কি তার জন্যই মেয়েটিকে এখানে আনার ব্যবস্থা করছে?
" তোর বোনকে এখানে আনবি? আগেই বলে রাখছি তাকে কিন্তু আমি বিয়ে করবো। প্রেম ট্রেম করবো না।
আবরার তাকায় সিয়ামের পানে। মুহুর্তেই সিয়াম এক দৌড়ে বেরিয়ে পড়ে রুম হতে। প্রথমে বাগানে যেতে হবে। ফোন খানা আস্ত থাকলেই হলো।
আবরার বিরবির করে আওড়ায়
"আই উইল কি*লল হার
তার সাহস হলো কি করল আমার আম্মুর পিকচার ফেসবুকে আপলোড দেওয়ার?