তোমাতেই_আসক্ত

তানিশা সুলতানা
পর্ব:0৩


এই মুহুর্তে বড়সড় একখানা ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলো সুইজারল্যান্ড এর জুরিখ নামক শহরের এক কোণায় অবস্থিত আবরার কুটিরে। এখানে উপস্থিত সকল মানব স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। যেনো আসমান ভেদ করে ব্রজপাত এসে পড়েছে তাদের মাথায়। বা প্রাণ ঘাতী ঘূর্ণিঝড় আক্রমণ করেছে তাদের। 




ইভানের কোল হতে পড়ে গিয়েছে এ্যানি৷ একটু ব্যাথা পেয়েছে কি সে? ম্যাউ ম্যাউ আওয়াজ তুলে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। সেই দিকে মোটেও হুশশ নেই কারোরই। বিরক্ত আবরার কপাল কুঁচকে এক পলক এ্যনির পাশে তাকায়। বিড়ালটি কি বুঝলো তাকে চোখ রাঙানো হলো?
সে গুটি গুটি পাশে এগিয়ে আবরারের পায়ের কাছে শুয়ে পড়ে।
সিয়াম নাকের পাটাতল ফুলিয়ে ফোঁস ফোঁস করছে সাপের মতো। যেনো এই মুহুর্তেই হামলে পড়বে আবরারের ওপর। ছোবল দিয়ে ধ্বংস করে দিবে এই মানবটিকে। ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে দেহখানা।
আবরার পরবর্তীতে ফোনে মনোযোগ দেয়। অফিসের কিন্তু ইমপটেন্ট ডকুমেন্টস চেক করছে। আমান ফ্লোরে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ে। কপাল চাপকাতে চাপকাতে আহাজারি করে বলে ওঠে
"মানি না আমি।
কিছুতেই মানবো না। এটা হতে পারে না। কোনো মতেই না। আমার কলিজা জ্বলি যাচ্ছে। আমার হৃদপিণ্ড পুরে যাচ্ছে। ওরেহহহ তোরা আবরারের মুখে কচু ঢুকিয়ে দে।
আহাদ আমানের পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে বলে
" স্যার প্লিজ উত্তেজিত হবেন না৷
আমান আহাদের হাত খানা ঝাঁড়া মে*রে ফেলে দেয়। চোখ পাকিয়ে বলে
"রাবিশ কথা বলবেন না।
আমি মরে যাচ্ছি যন্ত্রণায় আর শা লা তুই বলিস উত্তেজিত হবো না? শুধু উত্তেজিত কেনো? আমি তার বড়টা হবো।
চুপসে যায় আহাদ। কাচুমাচু হয়ে বসে থাকে আমানের পাশে।
এতোক্ষণে মুখ খোলে সিয়াম। গটগট পায়ে এগিয়ে আবরারের পাশে বসে। তার হাত থেকে ফোন খানা টেনে নিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বলে
" কি বলছিস তুই এসব? কবে বিয়ে করলি? ৬ বছর হলো এক সাথেই তো আছি৷ কোনো বা*ল*ছা*ল তো দেখলাম না।
কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো আবরার। বরং সিয়ামের হাত হতে ফোন নেওয়ার জন্য হাত বাড়ায়।
"ফোন দে।
" আগে জবাব দে
"প্রয়োজন বোধ করছি না।
হতাশ হয়ে ফোন খানা দিয়ে দেয় সিয়াম।
আবরার ফের মনোযোগী হয় ফোনে। যেনো আশেপাশের কোনো কথাই তার কানে যাচ্ছে না। সিয়াম ছোট ছোট নয়নে তাকিয়ে থাকে। মিথ্যে কথা বলে না আবরার। তাহলে মেয়েটিকে বিয়ে কবে করলো? মুহুর্তেই চিন্তিত হয়ে পড়ে।
আহাদ ফোনের স্কিনে সময় দেখে নেয়৷ এই মুহুর্তেই তাকে যেতে হবে।
তাই ব্যস্ততা দেখিয়ে বলে
"আমাকে যেতে হবে। আসছি হ্যাঁ কালকে আবরারের ক্লাস নিবো। বিয়ের ভুল ছোটাবো ঘাড় হতে।
পরপর আমানও বলে তারও যেতে হবে।
একে একে সকলেই প্রস্থান করে। শুধু রয়ে যায় সিয়াম। সে আবরারের সাথেই থাকে।
সকলেই যেতে ফোঁস করে শ্বাস টানে আবরার। ফোন খানা ফেলে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রথমেই দরজা আটকায়৷ পরপরই খুলে ফেলে পরনের থাকা সাদা রংয়ের শার্ট খানা। বুকের ক্ষত গভীর। শার্টে বেশ সমস্যা করছিলো।
সিয়াম এখনো তাকিয়ে আছে আবরারের পানে। যতক্ষণ না গোটা ঘটনা খুলে না বলবে ততক্ষণ সে দৃষ্টি সরাবে না এটা জানা আবরারের।
তাই কিনেচে ঢুকতে ঢুকতে বলে
"মেবি ২০১৫ সাল ছিলো। ওই মেয়েটার আম্মু মা রা যায়৷ তখন দাদুভাই রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করিয়েছিলো আমাকে দিয়ে। ব্যাসসস
সিয়ামের কপালে ভাজ পড়ে। মানে কি? সেই অনেক অনেক অনেক আগের বিয়ে। আবরার নিজ বক্তব্য শেষ করে রান্নার প্রসেসিং শুরু করে দিয়েছে। ব্যস্ত ভঙ্গিমায় প্রথমে ফ্রীজ থেকে মাংস বের করলো সেটা পানিতে ভিজিয়ে পেঁয়াজ কাটার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে।
সিয়াম বড় বড় পা ফেলে কিচেনে ঢোকে এবং আবরারের পাশে বসে পড়ে। গালে হাত দিয়ে বলে
" আই গ্রেস মেয়েটিকে তোর পছন্দ না। তুই তাকে ডিভোর্স দিতে চাস?
খচ খচ আওয়াজ তুলে পেঁয়াজ কাটতে কাটতে আবরার জবাব দেয়
"দ্যাটস নান অফ ইউওর বিজনেস।
" ধুরর সহজ কথা সহজ ভাবে জবাব দিতে পারিস না?
দেখ ভাই তাকে আমার ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে। একটা পুতুল সে। তুই তাকে পছন্দ করিস না৷ তাছাড়া তোদের বিয়েরও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। ভাই আমাকে ওকে দিয়ে দে। আই প্রমিজ বুকের ভেতরে আগলে রাখবো। ট্রাস্ট মি।
জবাব দেয় না আবরার। একটু বিচলিতও হয় না। চুপচাপ নিজের কাজ করতে থাকে। বিরক্ত হয় সিয়াম। তবে এইটুকু বুঝেছে আবরার মেয়েটিকে ০% ও পছন্দ করে না। মনে মনে বেশ খুশি হয়।
"ভাই তোর তখন লজ্জা লাগলো না এইটুকুনি মেয়েকে বিয়ে করতে? তুই কোনো ভাবে বিয়েটা আটকাতে পারতিস। রীতিমতো শিশু নির্যাতন করেছিস তুই। তোর নামে মামলা করবো আমি৷ হাজতে পুরবো। জেলের ভাত খাওয়াবো।
বেশ জোরেই কথাগুলো বলেছে সিয়াম। এ্যানির খোঁজে নিচে নেমেছে আদ্রিতা। তাই সিয়ামের শেষের কথা গুলো শুনে ফেলেছে৷ মুহুর্তেই বড় বড় পা ফেলে কিচেনে প্রবেশ করে খুশি হয়ে সিয়াম এর পাশে দাঁড়িয়ে বলে
" হ্যাঁ হ্যাঁ
চলুন থানায়। করে আসি মমলা। শুভ কাজে দেরি করতে নেই। আমি আছি আপনার পাশে। ওনাকে হাজতে রেখে এসে আমরা বারবিকিউ পার্টি করবো।
আবরার ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় আদ্রিতার পানে। সদ্য গোসল করেছে বোধহয়। লম্বা চুল গুলো বাঁধন ছারা করে রেখেছে। ঘন কালো চুল গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গোটা পিঠ জুড়ে। ভীষণ সিদ্ধ লাগছে।
সিয়ার হা করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। চোখের পলক পড়ছে না যেনো। একটু চেপে দাঁড়ায় আদ্রিতার দিকে। আনমনে বলে ওঠে
"ভীষণ সুন্দর তুমি আদ্রিতা। ঠিক যেনো পরি।
আদ্রিতার কানে সিয়ামের কথা গুলো বোধহয় ঢুকলো না। কেনোনা ততক্ষণে তার নজর পড়েছে আবরারের প্রসস্থ বাহুতে। নিলর্জ্জ লোক কথাকার। বাড়িতে একটা নাদুসনুদুস ছোট মেয়ে আছে তারপরও খালি গায়ে নাচছে? চরিত্র হীন।
নিজ ভাবনার মাঝেই শুনতে পায় লোকটার সেই চিরচেনা গম্ভীর কন্ঠস্বর
" কি চাই এখানে?
নরেচরে দাঁড়ায় আদ্রিতা। সিয়ামও দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। শুকনো ঢোক গিলে।
আদ্রিতা মুখ বাঁকিয়ে জবাব দেয়
"কিছু চাই না এমনি এসেছি। সারাক্ষণ রুমে বসে থাকতে পারি না আমি।
আবরার ছু ড়ি আদ্রিতার দিকে তাক করিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে
"মুখ বাঁকাবি না ওয়ার্নিং দিলাম।
আদ্রিতা বড় বড় চোখ করে পিছিয়ে যেতে থাকে। সিয়াম ঘাবড়ায়৷ একদম আদ্রিতার নিকটে দাঁড়িয়ে ছু ড়ি খানা গলায় চেপে দাঁতে দাঁত চেপে বলে
"এটা আমার বাড়ি। যখন তখন রুম হতে বের হওয়া যাবে না। এখানে সেখানে ঘুরঘুর করা যাবে না। ইটস মাই অর্ডার।
গলা শুকিয়ে আসে আদ্রিতার। লোকটা কি তাকে মে রে ফেলবে? সে কি ডাকাট? আল্লাহ এখন কে বাঁচাবে? ভয়ার্তক দৃষ্টিতে তাকায় সিয়ামের পানে। ইশারায় বলে " আমাকে বাঁচাও"
সিয়াম ইশারায় বোঝায় "আমি কিছু করতে পারবো না"
আদ্রিতা আবরারের টকটকে লাল চোখের পানে এক পলক তাকিয়ে রিনরিনিয়ে বলে
"এমন করছেন কেনো? আ.....মি তো কিছু করি নি। আমাকে মে রে ফেলিয়েন না প্লিজ। এখনো বাচ্চা কাচ্চার মুখ দেখা বারণ।
আবরার ছু ড়ি খানা শব্দ করে ফেলে দেয় ফ্লোরে এবং শক্ত করে আদ্রিতার হাত খানা মুঠো করে ধরে।
সিয়ার এবার একটু সাহস পেলো বোধ। এক পা এগিয়ে বলে
" আবরার কি করছিস তুই? ধরেছিস কেনো ওকে?
আবরার চোখ পাকিয়ে তাকায় সিয়ামের মুখ পানে। আঙুল তুলে বলে
"সী ইজ মাই পার্সোনাল প্রোপার্টি সিয়াম।
সিয়াম চুপ করে যায় এবং মাথা নিচু করে ফেলে। আবরার টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে আদ্রিতাকে
" আরেহহহ আরেহহহ করছেন টা কি? টানাটানি কেনো করছেন? এটা কিন্তু ঠিক না। মা আসুক বাড়িতে। আমি বলে দিবো সবটা।
ননস্টপ বকবক করতে থাকে আদ্রিতা। কিন্তু থামাতে পারে না আবরারকে। টানতে টানতে নিয়ে আসে আদ্রিতার জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষে। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় কক্ষের ভেতরে। তারপর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
চাপা আর্তনাদ ভেসে আসছে ভেতর থেকে। হুমড়ি খেয়ে ফ্লোরে পড়ে যাওয়ার ফলে বেশ ব্যাথা পেয়েছে পা এবং হাতের কনুইয়ে।
জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার পায়তারা চালায় আবরার।

ছোট্ট একখানা কক্ষ দেওয়া হয়েছে আদ্রিতাকে। এখানে আসবাবপত্র বলতে ওই একটা ড্রেসিং টেবিল খাট এবং কাবাড। আর কক্ষের সাথে ছোট্ট বারান্দা রয়েছে। সেই বারান্দা হতে বিশাল পাহাড় এর দেখা মেলে৷ গাড়ো সবুজ রংয়ের উঁচু উঁচু পাহাড় দেখতে মন্দ লাগে না। এদেশে বোধহয় পাখির সংখ্যা কম। তাই তো এই সোনালী সন্ধ্যায় কিচিরমিচির আওয়াজ ভেসে আসছে না। ঝাঁক বেঁধে আপন নিড়ে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ছে না। কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে শহরটা। এই শহরের বাতাসে প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছে না আদ্রিতা। বাংলাদেশে থাকলে এতোক্ষণ তিথি আপুর সাথে ঝগড়া করতে পারতো, তুহিন ভাই আইসক্রিম এনে দিতো। বড় মা বকা দিতে দিতে অস্থির হয়ে উঠতো।
রাগ করে আদ্রিতা মায়ের ফোন খানা নিয়ে ছাঁদে চলে যেতো। বাবা নামক লোকটিকে কল করতো। দীর্ঘক্ষণ কথা বলে মন ভালো করতে পারতো। আদ্রিতার মনে পড়ে গত কয়েকদিন হলো বাবার সাথে কথা বলা হয় না।
শীতের আমেজ পড়েছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে শীতের প্রতাপ। আদ্রিতা মনে করার চেষ্টা করে বাংলাদেশে শীতের শ ও ছিলো কি না? মনে পড়ে মগজ গলে যাওয়ার মতো উত্তাপ বাংলাদেশে। আর এখনে শীত? মানা যায়?
বারান্দায় যেনো শীতটা একটু বেশিই। সেই শীতকে উপেক্ষা করে বসে আছে আদ্রিতা। কিছুতেই সরবে না এখান থেকে৷ গায়ে গরম কাপড় নেই। ওই তো সাদা রংয়ের লেডিস শার্ট এবং রেইব্রো এর মতো বিভিন্ন রংয়ের স্কার্ট। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফ্লোরে। সেদিকে একটুও মনোযোগ নেই তার। মা খানিকক্ষণ আগেই এসেছে বোধহয়। আদ্রিতাকে ইতোমধ্যেই দুবার ডাকেছে। সাড়া দেয় নি সে। আর প্রতিজ্ঞা করেছে সাড়া দিবেও না। একটু বেশিই কষ্ট পেয়েছে কি না। এমনটা কেনো করবে?
তখন আবরার বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে রেখে গেলেও পরে আদ্রিতা ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছে। সে আর এই কক্ষ হতে বের হবে না। হবে না ওই পাষাণ পুরুষের মুখোমুখি। দেখাবে না এই মুখ খানা তাকে। যতদিন থাকবে সুইজারল্যান্ড নামক দেশে ততদিন এই বারান্দায় কাটিয়ে দিবে। ব্যাসস ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া শেষ।
দক্ষ হাতে গরুর মাংস এবং ভুনা খিচুড়ি রান্না করে ফেলে আবরার। সিয়ামও টুকটাক বেশ সাহায্য করেছে। বহু বছর বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকলেও বাঙালি খাবার বেশ পছন্দ আবরারের৷ সেই জোর ধরেই টুকটাক রান্না শিখেছে। মাঝেমধ্যেই বন্ধুরা মিলে হরেক রকমের রান্নার আয়োজন করে।
সিয়াম টমেটো শশা এবং কাঁচা পেঁয়াজ কাটছে সালাদ বানানোর জন্য। সেই তখন থেকে গাল ফুলিয়ে রেখেছে। সর্বক্ষণ বক বক করা সিয়াম আজকে চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে। আবরার অবশ্যই সেদিকে খেয়াল দিচ্ছে না।
ধীর গতিতে এ্যানি কিচেনে ঢোকে। চোখ মুখ তার বড়ই ক্লান্ত। হবে না? ইতোমধ্যে গোটা বাড়ি দুইবার চক্কর দিয়ে ফেলেছে। তারপরও আর্দিতাকে না পেয়ে হতাশ সে। কোথায় গেলো তার মাম্মাম?
এ্যানির পানে নজর পড়তেই সিয়াম এর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। ছু ড়ি খানা নামিয়ে টিশার্টেই হাত মুছে নেয়। অতঃপর হাঁটু মুরে বসে কোলে তুলে এ্যানিকে। নরম তুলতুলে শরীরে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু খায় শব্দ করে। এবং শুধায়
"কোথায় গিয়েছিলে তুমি? তোমার বিরহে আমি আধমরা হয়ে যাচ্ছিলাম।
বিড়াল ছানাটি বেশ বিরক্ত। সে অপরিচিত মানুষের কোলে উঠতে চায় না। তারওপর আবার চুমু। সিয়াম এর থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করে ওঠে। মিউ মিউ আওয়াজ তুলে ছেড়ে দিতে বলে। তবে সিয়াম ছাড়ে না। বরং আরও এক খানা চুমু খেয়ে বলে
"ওরেহহহহ শা লা কোলে থাক। তোর মায়ের কাছে নিয়ে যাবো।
বলেই দাঁড়িয়ে পড়ে। আবরারকে উদ্দেশ্য করে বলে
" ব্রো টমেটো এক পিছ কেটেছি। বাকি গুলো তুই কেটে নিস। আমি আদ্রিকে ডেকে আনি। ঠিক আছে?
বড় বড় পা ফেলে কিচেন ত্যাগ করে সিয়াম। আবরারের কোনো ভাবান্তর হয় না। সে নিজ গতিতে কাজ করে যাচ্ছে। যেনো সিয়াম এর কথা শুনতেই পায় নি৷
অহনা এবং তার বাচ্চাকে সাথে করে এনেছে আতিয়া বেগম। এই মুহুর্তে কিছুতেই মেয়েকে শশুর বাড়ি যেতে দেবেন না৷ মা আর শাশুড়ী কি এক হলো? মায়ের মতো আদর যত্ন কখনোই শাশুড়ী করতে পারবে না। আবরার ছোট ছোট নয়নে বোন এবং বাচ্চাটিকে দেখছে। পাঁচ দিন হলো বাচ্চাটি দুনিয়াতে এসেছে। অথচ একবারও আবরার হাসপাতালে যায় নি দেখতে। ওর সব বন্ধুই গিয়েছিলো। সিয়ার তিন রাত্রি হাসপাতালে কাটিয়েছে। এমনকি অহনাকে হাসপাতালে সিয়ামই নিয়ে গিয়েছিলো। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে অহনা। তার কোলে ছোট্ট ছানাটি। যে হাত পা নেরে খেলছে। আতিয়া বেগম ব্যস্ত ভঙ্গিমায় কিচেনে খাবার বানাচ্ছে অহনার জন্য। আবরারের রান্না করা গরুর মাংস ভুনা খিচুড়ি খাওয়া বারণ অহনার৷
সিয়াম আদ্রিতার কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দুবার টোকা দেয়। কোনো রেসপন্স না পেয়ে শুকনো কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নেয়। তারপর নরম স্বরে বলে
"আদ্রি অহনা এসেছে তার ছানা নিয়ে। কি যে কিউট। তুমি কোলে নিবে?
অভিমানী আদ্রিতার অভিমান গলে জল হয়ে যায়। ছোট্ট বাচ্চা তার বড়ই ভালো লাগে। বাংলাদেশে তাদের পাশের ফ্ল্যাটে একটা বাচ্চা ছিলো। আদ্রি সদা গিয়ে সেই বাড়িতে বসে থাকতো, বাবুকে কোলে নিতো। এর জন্যও কম বকা খেতে হয় নি তাকে। আর আজকে নিজ বাড়িতেই এক খানা ছানার আবির্ভাব হয়েছে। আর আদ্রিতা কি না তাকে কোলে নিবে না? এটা হতে পারে?
বারান্দা হতে উঠে এক দৌড়ে দরজার পাশে এসে দাঁড়ায়। শিওর হওয়ার জন্য বলে
" মিথ্যে বলছেন না তো?
"একদম না৷ সিয়াম কখনো মি*থ্যে বলে না। সদা সর্বদাই সত্য বলে। তাই তো আমাকে সবাই ভালোবেসে সত্যেন্দ্রনাথ ভালু বলে ডাকে।
আদ্রিতা দরজা খোলে। সিয়ামের পানে তাকিয়ে মুচকি হাসে। এ্যানি আদ্রিতাকে দেখতে পেয়েই মিউ মিউ আওয়াজ তুলে হাত এগিয়ে দেয়। যেনো শত শত বছর পরে দেখা মিলেছে মায়ের।
আদ্রিতা তাকে কোলে নেয়। মাথায় পরপর কয়েকটা চুমু খেয়ে এগিয়ে যায় ড্রয়িং রুমের পানে। সিয়াম মাথা চুলকে বিরবির করে বলে
" প্রেমে পড়েছে মন প্রেমে পড়েছে
অচেনস এক মানুষ আমায় পা*গল করেছে
অহনা এক পলক তাকায় আবরারের পানে। বড়ই আশা ছিলো তার আবরার এগিয়ে আসবে বাবুকে কোলে নিবে, অহনাকে জিজ্ঞেস করবে "কেমন আছিস"
কিন্তু সেসব কিছুই হয় না। পাষাণ আবরার বোন ভাগিনীকে এড়িয়ে নিজ কক্ষের পানে অগ্রসর হয়।
আঁখি পল্লব ভিজে ওঠে অহনার। কি করেছে সে? কেনো এতো দুরুত্ব তাদের দুই ভাই বোনের মধ্যে?
অনেক ভেবেও বুঝতে পারে না তার দোষটা কোথায়। আবরার তো ছোট থেকেই এমন। বাবা মা বোন কারোর প্রতিই তার তেমন টান ছিলো না। আল্লাহ তাকে হার্টলেস বানিয়েছে হয়ত।
আদ্রিতা ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে অহনার পাশে বসে৷ বাবুর পানে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলে
"আসসালামু আলাইকুম আপু। ভালো আছেন? আমি আদ্রিতা। চিনেছেন আমায়?
অহনা মৃদু হাসে।
" ওয়ালাইকুম আসসালামু। চিনেছি তোমায়।
"বাবুকে একটু কোলে নিবেন? আমি হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে এসেছি৷
অহনা আদ্রিতার কোলে দেয় বাবুকে। সে কি খুশি আদ্রিতাকে। একটু পরপরই চুমু খাচ্ছে বাবুর মাথায়, হাতে, গালে, নাকে এবং খিল খিল করে হেসে উঠছে। এ্যানি এসে আদ্রিতার পায়ের কাছে বসে পড়ে। কুটুর কুটুর নয়নে দেখতে থাকে তার মনিবকে এবং লেজ নাড়াতে থাকে।
যেহেতু অহনা অসুস্থ এবং সিঁড়ি বেয়ে যাতাযাত করতে পারবে না। তাই তার জন্য নিচের একটা কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছে। সেই কক্ষে চলে যায় অহনা। বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার। একটু রেস্ট নিবে। বাচ্চার দায়িত্ব আদ্রিতাকে দিয়ে গিয়েছে।
আতিয়া বেগম এর রান্না শেষ৷ তিনি চলে যায় অহনাকে খাওয়াতে।।
দীর্ঘ ক্ষণ বাবুকে নিয়ে বসে থাকে আদ্রিতা। ভালোই লাগছিলো এতোক্ষণ। তবে এখন পিঠ চুলকাচ্ছে। বাবুকে সে দুই হাত দিয়েই ধরে রেখেছে। একদম ছোট এবং তুলতুলে। যদি পরে যায়? সাবধানের মার নেই৷ অগত্য পিঠ চুলকাতে ব্যর্থ হয়ে এদিক ওদিক দৃষ্টি ফেরায়। কেউ এদিকে আসছে না কেনো? আসলে তো একটু চুলকে দিতে বলতে পারতো। কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না এরাই হচ্ছে মূখ্য বিষয়।
বিরক্ত আদ্রিতা বিরবির করে বকা দিতে থাকে সবাইকে।
তখনই দেখতে পায় আবরার নামছে সিঁড়ি বেয়ে। সুট বুট পড়ে চুল টুল খাঁড়া করে। লাট সাহেব যেভাবে একেকটা সিঁড়ি অতিক্রম করছে যেনো বলিউড হিরো আবরার তাসনিন। অবশ্যই হিরোদের মতোই দেখায় তাকে। খালি ওই একটু ঠোঁটে সমস্যা। মনে মনে ভেংচি কাটে আদ্রিতা। বিরবির করে বলে
"শা লা কোথাকার।
ভাব খানা ধরে কি? যেনো রাজপুত্রুর কোনো রাজ্যের।
ওরেহহহ গোলামের পুত ইচ্ছে করে তোর লম্বা চুল গুলো কুচি কুচি কেটে দিয়ে ভাব ছোটাতে।
আবরারকে বকতে বকতেই এক খানা মাথায় আসে। " এই শালাকে দিয়েই কাজটা করিয়ে নেওয়া যাক"
বেমালুম ভুলেই গিয়েছে খানিকক্ষণ আগে এই পাষাণ লোকটা তাকে রুম বন্দী করে রেখেছিলো।
শুকনো কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নেয় আদ্রিতা। তারপর বলে ওঠে
"বড় ভাই
পিঠ চুলকানিটা আমাকে একটু এনে দিন তো।
আবরারের পা থেমে যায়। ভ্রু কুচকে তাকায় আদ্রিতার পানে।
" পিঠ চুলকানি চিনেন না? ওই যে লম্বা করে দাঁত থাকে চারটা। জামার ফাঁকা দিয়ে ঢুকিয়ে অনায়াসে পিঠ চুলকানো যায়। চিনেন না?
আবরার দাঁতে দাঁত চেপে "ইডিয়েট" শব্দটা আওড়িয়ে বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায় সদর দরজা দিয়ে।
চিন্তিত হয় আদ্রিতা। অনেক হিসেব নিকেশ করে আবিষ্কার করে
"হয়ত সুইজারল্যান্ড এ পিঠ চুলকানির নাম ইডিয়েট"